নবীদের কাহিনী

নবী-রাসূলগণের ঘটনা -২

Alorpath 6 months ago Views:123

নবী-রাসূলগণের ঘটনা- ডঃ মোঃ আব্দুল কাদের


নবী-রাসূলগণের ঘটনা -১

. ইবরাহীম ইসমাঈলেরআলাইহিস সালাম ঘটনা থেকে শিক্ষা

ইবরাহীমআলাইহিস সালামের ঘটনা থেকে আমরা আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস এবং বিপদে একত্ববাদের প্রতি দৃঢ়তা, ব্যক্তিজীবনে মুশরিক মা-বাবার সাথে আচরণ ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি যেমন,

মানুষ যখন জ্ঞান বিশ্বাসের আলোকে কোনো আকীদা কায়িম করে নেয় এবং তা তার অন্তরে বসে তার আত্মার সাথে মিশে এবং তার সীনার মধ্যে প্রস্তরাঙ্কনের ন্যায় দৃঢ়ভাবে অঙ্কিত হয়ে যায়, তখন তার চিন্তা কল্পনা, তার ভাবনা বিচার এবং তার ইহাতে ডুবে থাকা এমন স্তরের শক্তিশালী দৃঢ় হয়ে যায় যে, বিশ্বের কোনো আকস্মিক ঘটনা কোনো কঠিন বিপদও তাকে তার স্থান হতে নড়াতে পারে না সে তার জন্য নিশ্চিন্ত মনে আগুনে লাফিয়ে পড়ে, বিনাদ্বিধায় সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নির্ভয়ে শুলিকাষ্ঠে চড়ে প্রাণ বিসর্জন দেয় ইবরাহীমআলাইহিস সালামের দৃঢ় সংকল্প দৃঢ়তার দৃষ্টান্ত তার জন্য একটি জীবন্ত উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

সত্যকে রক্ষা করার জন্য এমন প্রমাণ পেশ করা উচিৎ যা শত্রু এবং মিথ্যা পূজারীর অন্তরের অন্তঃস্থলে পৌঁছে যায় এবং সে মুখে যদিও সত্যকে স্বীকার করে না কিন্তু তার অন্তর সত্যকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়, বরং কোনো কোনো সময় মুখও ইচ্ছার বিরুদ্ধে সত্য ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকতে পারে না যেমন, কুরআন মাজীদের আয়াতটিবিতর্ক কর উত্তমরূপে’’ [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৫] তথ্যেরই ঘোষণা করছে

পয়গাম্বর রাসূলগণের পন্থা হলো, তারা ঝগড়া তর্ক বির্তকের পথে চলে না তাদের দলীল প্রমাণসমূহের ভিত্তি অনুভবনীয় বস্তু এবং চাক্ষুষ দর্শনের উপর হয়ে থাকে কিন্তু তা সহজবোধ্য যুক্তির উপর ইবরাহীমআলাইহিস সালামের কাওমের সাধারণের সাথে মূর্তিপূজা নক্ষত্র পূজা সম্বন্ধীয় বির্তক এবং নমরূদের সাথে বির্তক এর স্পষ্ট উজ্জ্বল প্রমাণ

কোনো সত্য বিষয়কে প্রমাণ করার জন্য দলীলের মধ্যে বিরোধী পক্ষের বাতিল আকিদাকে কাল্পনিকভাবে মেনে নেওয়া, মিথ্যা বা সে বাতিল আকিদা স্বীকার করা নয়; বরং শত্রু পক্ষকে পরাভূত করার জন্য সাময়িকভাবে বাতিলকে মেনে নেওয়া কিংবা মাআরীয বা পরোক্ষ ইঙ্গিত বলা হয় পদ্ধতির প্রমাণ আনয়ন বিপক্ষকে নিজের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য করে দেয় ইবরাহীমআলাইহিস সালাম জনসাধারণের সাথে বিতর্কের মধ্যে প্রমাণের দিকটাই অবলম্বন করেছিলেন যা মূর্তিপুজকদেরকে স্বীকার করতে বাধ্য করেছিল যে, মূর্তি কোনো অবস্থাতেই শোনেও না জবাবও দিতে পারে না


যদি কোনো মুসলিমের পিতা-মাতা উভয়ই মুশরিক হয় এবং কোনোক্রমেই শির্ক থেকে বিরত না হয় তবে তাদের মুশরিকী জীবন থেকে অসন্তুস্ট এবং পৃথক থেকেও তাদের সাথে দুনিয়াবী কাজ কারবারে আচরণেও এবং আখিরাতের উপদেশ নসীহতের সম্মান ইজ্জতের সাথে ব্যবহার করা উচিৎ কঠোর কর্কশ ব্যবহার করা অনুচিত ইবরাহীমআলাইহিস সালামের ব্যবহার আযরের সাথে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্মপদ্ধতি আবূ তালিবের সাথে বিষয়ে অকাট্য সুনিশ্চিত প্রমাণ

যদি মুমিনের অন্তর বিশুদ্ধ আকিদার ওপর নিশ্চিন্তে মুখ অন্তরের ঐক্যের সাথে ঈমান রাখে, কিন্তু চাক্ষুষ দর্শন অনুভব করার জন্য কিম্বা যথার্থ বিশ্বাসের স্তর পর্যন্ত লাভ করার উদ্দেশ্যে কোনো ঈমান বা বিশ্বাসের মাসআলায়ও প্রশ্ন এবং অন্বেষণের পথ অবলম্বন করে এবং অন্তরের তৃপ্তি প্রার্থী হয়, তবে অন্বেষণ সন্দেহ এবং কুফুর নয়, বরং প্রকৃত ঈমান

আল্লাহ তাআলা যে সমস্ত মহাপুরুষকে নিজের সত্য প্রচারের জন্য নির্বাচন করে থাকেন তাদের সম্মুখে আল্লাহর মহব্বত এবং সততা ব্যতীত অন্য কোনো বস্তু বাকীই থাকে না কারণে প্রথম থেকেই তাদের মধ্যে যোগ্যতা প্রদান করা হয় যে, তারা শৈশবকাল হতেই নিজেদের সমসাময়িকদের মধ্যে বিশিষ্ট্য উজ্জ্বলরূপে পরিদৃষ্ট হন এবং আল্লাহর রাস্তায় পরীক্ষাসমূহকে আনন্দের সাথে সহ্য করে ধৈর্য্য সন্তুষ্টির উত্তম আদর্শ পেশ করতে থাকেন ইসমাঈলআলাইহিস সালামের ঘটনাটি এর প্রমাণের জন্য উপযুক্ত সাক্ষী এবং হাজার হাজার উপদেশমূলক দৃষ্টান্ত

নবী-রাসুলগণের দাওয়াতী মূলনীতি

৪. ইউসুফআলাইহিস সালামের ঘটনা থেকে শিক্ষা 

ইউসুফআলাইহিস সালামের বিস্ময়কর অভিনব কাহিনীতে ধী-সম্পন্ন লোকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক মাসআলা নিহিত আছে আসলে কিচ্ছাটি শুধু একটি ঘটনাই নয়, ফযীলত আখলাকের এমন একটি সূবর্ণ কাহিনী যার প্রত্যেকটা দিক নছীহত জ্ঞানের মণি-মুক্তা দ্বারা কানায় কানায় পরিপূর্ণ

ঈমানী শক্তি, আত্মসংযম, সবর, শুকর, পরিত্রতা, দীনদারী, বিশ্বস্ততা, ক্ষমা, দীন প্রচারের অনুপ্রেরণা, আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, আত্মসংশোধন আল্লাহভীতির ন্যায় উচ্চ পর্যায়ের আখলাক এবং মহৎ গুণাবলীর একটি দুর্লভ স্বর্ণ শৃঙ্খল যা কিসসাটির প্রত্যেক পরতে দেখা যায় তন্মধ্যে নিম্ন হতে নিম্নবর্ণিত কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য

যদি কোনো ব্যক্তির নিজস্ব প্রকৃতি স্বভাব উত্তম হয় এবং তার পরিবেশও পবিত্র-নিস্কলঙ্ক হয়, তবে সে ব্যক্তির জীবন মহৎ চরিত্রাবলীর মধ্যে সুষ্পষ্ট এবং উচ্চস্তরের গুণাবলীর মধ্যে বিশিষ্ট হবে এবং তিনি সর্ব প্রকারের মাহাত্ম্য বুযুর্গীর ধারক বাহক হবেন। ইউসুফআলাইহিস সালামের পবিত্র যিন্দিগী তার অতি উত্তম দৃষ্টান্ত। তিনি ইয়াকূব, ইসহাক এবং ইবরাহীমআলাইহিমুস সালামের মতো অতি উচ্চ মর্যাদাশলি নবী পয়গাম্বরগণের সন্তান ছিলেন, সুতরাং নুবুওয়াত রিসালাতের দোলনায় প্রতিপালিত হন। নবুওয়াত রিসালাতের পরিবারের পরিবেশে শিক্ষা দীক্ষা লাভ করেন। তার নিজস্ব নেক প্রকৃতি এবং স্বভাবগত পবিত্রতা যখন এমন পবিত্র পরিবেশ দেখতে পায় তখন তার সমূদয় প্রশংসনীয় ফযীলত গুণ প্রদীপ্ত হয়ে উঠে! ফলে শৈশব, যৌবন এবং বাধ্যর্ক্যর এমনকি জীবনের সমস্ত কাজ পরহেযগারী, সাধুতা, ধৈর্য্য, দ্বীনদারী এবং আল্লাহর ভালোবাসার এমন উজ্জ্বল বিকাশক্ষেত্র হয়ে গেল যে, মানুষের জ্ঞান এতগুলো পূর্ণ গুণাবলীর সমাবেশযুক্ত একজন মানুষকে দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে যায়
যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে আল্লাহর প্রতি ঈমান সঠিক এবং সুদৃঢ় হয় এবং তার ওপর তার বিশ্বাস মজবুত দৃঢ় হয়, তবে পথের সমস্ত জটিলতা মুশকিল তার জন্য সহজ শুধু নয়; বরং সহজতর হয়ে যায়, সত্য দর্শনের পর সমস্ত বিপদ মুসীবত অতি তুচ্ছ হয়ে যায়। ইউসুফআলাইহিস সালামের গোটা জীবনের মধ্যে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে পরিদৃষ্ট হয়।

পরীক্ষা, মুসীবত এবং ধ্বংসের আকৃতিতেই হোক কিম্বা ধন দৌলত এবং রিপুর কামনা বাসনার সুন্দর সুন্দর উপকরণের আকারেই হোক, সর্বাবস্থায় মানুষের উচিৎ আল্লাহ তাআলার দিকে রুজু হওয়া। আল্লাহরই দরবারে কাকুতি মিনতি করা যেন তিনি সত্যের ওপর দৃঢ়পদ রাখেন এবং ধৈর্য্য দান করেন। আযীযে মিসরের বিবি এবং মিসর শহরের সুন্দরী রমণীদের অসৎ প্ররোচন এবং তাদের মনস্কামপূর্ণ না করলে জেলে আবদ্ধ করার ধমক। অতঃপর জেলখানার নানা প্রকার কষ্ট সমস্ত অবস্থায় ইউসুফআলাইহিস সালামের নির্ভর, তার দো এবং কাকুতি-মিনতিসমূহের কেন্দ্রস্থল কেবল আল্লাহরই সাথে সংশ্লিষ্ট দেখা যায়। তাকে আযীযে মিসরের সম্মুখে আবেদন করতেও দেখা যায় না। ফিরআউনের দরবারেও আবদার করতে দেখা যায় না। তিনি সে মিসরের সুন্দরী রমণীদের সঙ্গে মন লাগাচ্ছে না। নিজের পালনকারীর সুন্দরী স্ত্রীর সঙ্গেও না বরং প্রত্যেক ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহ তাআলার সাহায্য প্রার্থীই দেখা যায়। যেমন তিনি বলেছেন: হে আমার রব, মহিলারা আমাকে যেদিকে আহ্বান করছে তার চেয়ে জেলখানাই আমার নিকট শ্রেয়” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৩৩]

আল্লাহর আশ্রয় ভিক্ষা চাইছি নিঃসন্দেহে তিনি (আযীয মিসর) আমার মুরব্বি আমাকে সম্মান মর্যাদার সহিত রেখেছেন” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ২৩]

যখন আল্লাহ তাআলার মহব্বত এবং ভালোবাসা অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে, তখন মানুষের জীবনের সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য একমাত্র তিনিই হয়ে যান। তার দীনের দাওয়াত, তাবলীগের আকাঙ্ক্ষা সর্বক্ষণ ধমনীসমূহে শিরায় শিরায় ধাবিত হতে থাকে। যেমন, জেলখানায় কঠিন মুসীবতের সময় নিজের সাথীদের সাথে ইউসুফআলাইহিস সালামের সর্বপ্রথম কথা এটিই ছিল। যা আল-কুরআনের

হে আমার জেলখানার বন্ধুদ্বয়! পৃথক পৃথক বহু দেবতার উপাসনাই কি ভালো? না কি একমাত্র মহা শক্তিশান আল্লাহ তাআলার ইবাদতই উত্তম?” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৩৯] শীর্ষক বাণীতে উল্লেখ পাওয়া যায়

দীনদারী বিশ্বস্ততা এমন একটি নিআমত যে, একে মানুষের ধর্মীয় পার্থিব সৌভাগ্যের চাবিকাঠি বলা যেতে পারে। আযীযে মিসরের এখানে ইউসুফআলাইহিস সালাম যেরূপে প্রবেশ করেছিলেন, ঘটনাবলীর বিস্তৃত বিবরণে তা জানা গিয়েছে। এটি ইউসুফআলাইহিস সালামের দীনদারী এবং বিশ্বস্ততারই ফল ছিল যে, প্রথম তিনি আযীযে মিসরের দৃষ্টিতে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন এবং প্রিয় হন। তৎপর একেবারে সমগ্র মিসর রাজ্যের মালিকই হয়ে বসেন।

আত্মনির্ভরশীলতা মানুষের উচ্চ শ্রেণির গুণাবলীর অন্তর্গত একটি মহৎ গুণ। আল্লাহ তাআলা যাকে দৌলত দান করে সে ব্যক্তিই দুনিয়ার সর্বপ্রকার মুসীবত দুঃখ কষ্ট অতিক্রম করে দুনিয়া আখিরাতের উন্নতি লাভ করতে পারে



মন্তব্য