ঈমান

দুর্বল ঈমানের বহিঃপ্রকাশ। পর্ব- ২

Alorpath 5 months ago Views:196

নিশ্চয়ই মুমিন হচ্ছে মুমিনের শরীরের মাথার মতো. একজন মুমিন অপর মুমিনের দুঃখে দুঃখিত হবে, যেমন মাথায় ব্যথা হলে সারা শরীর ব্যথা অনুভব করে।


১২. মুসলমান ভাইয়ের বিপদ দেখলে বা কোনো ক্ষতি হলে অথবা ব্যর্থতা দেখলে খুশি হওয়া:


একথা ভেবে খুশি হয় যে ওর তো একটা ক্ষতি হলো। ওহো! এটা কতইনা ভাল হল! এ ধরনের মানসিকতা ঈমানী দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।

১৩. শুধুমাত্র কাজটি অপছন্দনীয় কিনা তা ভাবা:

কোন কাজে গুনাহ হবে কি না তা মোটেও না ভাবা। অনেকেই জিজ্ঞেস করে, এ কাজ করলে গুনাহ হবে কিনা? এটা কি হারাম না মাকরুহ? এ ধরনের মনোবৃত্তি হারামের দিকে নিয়ে যায়- সন্দেহযুক্ত বিষয়কে কর্মে পরিণত করার জন্য। কেউ সন্দেহযুক্ত কাজ করলে এ আশঙ্কা রয়েছে যে একদিন সে হারাম কাজ করে ফেলবে। এ ব্যাপারে রাসূল সাঃ সতর্ক করে বলেছেন, "যে ব্যাক্তি সন্দেহ-সংশয়ে পতিত হলো, সে হারাম কাজ করলো। যেমন, কেউ যদি নিষিদ্ধ চারণভূমির পাশে ছাগল চরায়; তাহলে আশঙ্কা রয়েছে যে, সে নিষিদ্ধ চারণভূমিতে চরাবে।" (সহি বুখারী: ২২)

বরং অনেকে ফতুয়া চায় এই বলে যে, যদি বলা হয় এটা হারাম; তাহলে প্রশ্ন করে, এর হুরতাম (অবৈধতা) কি খুবই কঠিন? এটা করলে কেমন গুনাহ হতে পারে? এ ধরনের লোক তো খারাপ বা মাকরুহ কাজ হতে দূরে থাকেই না; এমনকি হারাম কাজ পরিহার করার মানসিকতা রাখে না। এরা হারাম কাজ করতে গিয়ে গুনাহের প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপই করে না। এদের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেন, "আমি আমার উম্মতের কিছু সম্প্রদায়ের কথা জানি, তারা কেয়ামতের দিন তিহামা পাহাড় পরিমাণ নেকি নিয়ে হাজির হবে। আল্লাহ এগুলি কি ধূলিকণার মতো উড়িয়ে দেবেন। হযরত সাওবান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এদের গুণাবলী বলুন, এদের চিহ্নিত করুন, যেন আমরা অজান্তে এদের মত না হয়ে যাই। তিনি বলেন, তারা তোমাদেরই ভাই এবং স্বজাতি। তোমাদের মতোই রাতে তাহাজ্জত পড়বে; কিন্তু তারা এমন লোক, সুযোগ পেলেই হারাম কাজ করে বসবে।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৪৫)


হযরত ইবনে মাসউদ রাযিআল্লাহু আনহু মুমিন এবং মুনাফিকের অবস্থা এভাবে বর্ণনা করেন, "মমিনুল ব্যক্তি তার গুনাকে কিভাবে দেখে, যেন সে পাহাড়ের নিচে বসে আছে আর সেটি তার ওপর পড়ে যাবে- এ আশঙ্কায় সে শঙ্কিত। আর পাপী ব্যক্তি তার গুনাহকে এভাবে দেখা, যেন তার নাকের উপর একটা মাছি বসেছে, আর সে তার হাতের ইশারায় তাড়িয়ে দিল।" (সহি বুখারী: ৬৩০৮)

১৪. ভালো কাজকে তুচ্ছ জ্ঞান করা এবং ছোট ছোট নেকির আজকে গুরুত্ব না দেয়া:

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন আমরা যেন এমন না হই। ইমাম আহমদ হযরত আবু জরাই আল হুজাইমী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন- "আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলাম। অতঃপর বললাম, হে আল্লাহ রাসুল! আমরা গ্রামের অধিবাসী। আমাদেরকে এমন কিছু শিক্ষা দিন, যা দ্বারা আল্লাহ তায়ালা আমাদের কল্যাণ করেন। তখন তিনি বললেন, তুমি নেকীর কাজ কে তুচ্ছ জ্ঞান করবে না। যদিও তুমি তোমার ভাইয়ের পাত্রে বালতি রেখে একটু পানি ঢেলে দাও অথবা তো্মার কোন ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বল।"(মুসনাদে আহমদ: ৫/৬৩)

এজন্যই কারো পাত্রে একটু পানি ঢেলে দেওয়া বা কারো সাথে হাসিমুখে কথা বলা এবং মসজিদ থেকে ময়লা আবর্জনা দূর করা- এমন ছোট ছোট কাজও গুনাহ মাফের কারন হবে। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার উপর সন্তুষ্ট হয়ে এসব কাজের জন্য তাকে ক্ষমা করে দিবেন। আপনি কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিসটি জানেন না যে, তিনি বলেছেন, "এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখল, এক গাছের একটা ডাল রাস্তার উপর পড়ে আছে। সে ব্যক্তি বলল, আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই এটাকে মুসলমানের পথ থেকে সরিয়ে দেবো; যেন তা তাদেরকে কষ্ট না দেয়। এজন্য তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়।" (সহিহ মুসলিম: ১৯১৪)

১৫. মুসলমানদের সমস্যার ব্যাপারে গুরুত্ব না দেওয়া:

এর জন্য কোন অনুদান বা নিজের পক্ষ থেকে দোয়া না করা। সে একবারে ঠাণ্ডা অনুভূতির লোক। বিশ্বের মুসলমানদের ওপর কোথাও আক্রমণ হচ্ছে বা কোথাও তারা প্রাকৃতিক বিপদে পড়েছে- এ ব্যাপারে তার মাঝে সামান্য অনুভুতিও নেই। সে শুধু নিজের নিরাপত্তা নিয়ে সন্তুষ্ট। এর কারণ হচ্ছে তার ঈমান দুর্বল। কেননা, একজন মুমিন অবশ্যই এমন স্বভাব এর বিপরীত হবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "নিশ্চয়ই মুমিন হচ্ছে মুমিনের শরীরের মাথার মতো. একজন মুমিন অপর মুমিনের দুঃখে দুঃখিত হবে, যেমন মাথায় ব্যথা হলে সারা শরীর ব্যথা অনুভব করে।' (মুসনাদে আহমদ: ৫/৩৪০)

১৬. ভাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করা:

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে বা ইসলামের স্বার্থে তার অপর ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক গড়ে, তাহলে তা একমাত্র ছিন্ন হতে পারে, যদি তাদের কেউ কোনো গুনাহ করে ফেলে তখনই।" (আদাবুল মুফরাদ: ৪০১)

এটিই প্রমাণ যে গুনাহের কারণে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। গুনাহের কারণে ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং তার ব্যাপারে দেয়া আল্লাহ তায়ালা'র প্রতিরোধ ভেঙে যায়। অথচ, আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করে থাকেন।

১৭. দ্বীনের কাজে দায়িত্ব পালনের প্রতি অনুভূতি না থাকাও দুর্বল ঈমানের বহিঃপ্রকাশ:

এমন লোকেরা দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের জন্য এগিয়ে আসে না। এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীদের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা ইসলামে প্রবেশ করার সাথে সাথেই দিন প্রচারকে নিজেদের দায়িত্ব বলে মনে করেন। তোফাইল ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এর ঘটনা দেখুন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পরপরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অনুমতি চেয়ে ছিলেন, নিজ সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে গিয়ে দ্বীন প্রচারের জন্য। আজ আমরা অনেকেই দাওয়াতের কাজ শুরু করতে বেশ দেরি করি।

১৮. বিপদাপদে ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়া:

ভয়ে কম্পমান থাকে, যখন কোনো বিপদের কথা শুনে। বলিষ্ঠভাবে দৃঢ়তার সাথে সমস্যার সমাধান করতে পারে না। আর এর পিছনে মূল কারণ হলো- ঈমানের দুর্বলতা।

১৯. অনর্থক ঝগড়া-বিবাদ বা তর্ক-বিতর্ক করা:

এরা প্রমাণ ব্যতিরেকেই তর্ক বিতর্কে লিপ্ত থাকে এবং সঠিক উদ্দেশ্য ছাড়াই অহেতুক বিতর্ক করে মানুষকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে ফেলে। বর্তমান যুগে অধিকাংশ লোকেরই তর্ক বিতর্ক হয় বাতিল বিষয় নিয়ে। এই বদ অভ্যাস পরিত্যাগ এর জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদিসটিই যথেষ্ট। তিনি বলেন- “আমি সেই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের একটা ঘরের জিম্মাদার, যে ব্যক্তি বিতর্ক পরিহার করেছে; যদিও সে হক পথেই ছিল।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮০০)

আরো পড়ুন- দুর্বল ঈমানের বহিঃপ্রকাশ। পর্ব- ১

২০. দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ ও এর প্রতি ঝুঁকে পড়া:

দুনিয়ার মোহে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ে যে, যদি কোন মাল বা টাকাপয়সা ছুটে যায়; তাহলে মনে খুব যাতনা অনুভব করে। নিজেকে খুবই বঞ্চিত মনে করে। যখন দেখে অন্য কেউ তা পাচ্ছে তখন অন্যের ব্যাপারে মনে হিংসার উদ্রেক ঘটে; যেটা ঈমানের পরিপন্থী। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "কোন বান্দার অন্তরে ইমন ও হিংসা বিদ্বেষ একত্র হতে পারে না।" (সুনানে নাসাঈ: ৩১০৯)

২১. জনশ্রুতি কে বর্ণনার জন্য গ্রহণ করা:

তার কথায় ঈমানদারের পরিচয় পাওয়া যায় না। তার কথায় কোরআন, হাদিস বা সালাফে সালেহীনের উদৃতি থাকেনা।

২২. নিজেকে নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকায় এবং বাড়াবাড়ি করা:

পানাহার, পোশাক-পরিচ্ছদ, ঘরবাড়ি, গাড়ি ঘোড়া ইত্যাদির ক্ষেত্রে দেখা যায়- নিজের পূর্ণতার জন্য বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এগুলোর জন্য পেরেশান হচ্ছে। ঘরবাড়ি আসবাবপত্রের জন্য টাকা পয়সা, সময় ব্যয় করছে। এটি প্রকৃতপক্ষে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ নয়। অথচ, তার মুসলমান ভাইকে কত কষ্ট-যাতনা মাঝে রয়েছে। এটি প্রকৃতপক্ষে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ নয়। অথচ, তার মুসলমান ভাইয়েরা কত কষ্ট যাতনা মাঝে রয়েছে। তারা কত অভাব-অনটনের শিকার হয়ে আছে। আর এদিকে সে নিজের সুখের জন্য এমন বিষয়ে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত, যে ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লামের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যখন তিনি মুয়াজ ইবনে জাবাল রাযিআল্লাহু আনহুকে ইয়ামেনের শাসক কর্তা হিসেবে প্রেরণ করেন, তখন তাঁকে এই বলে উপদেশ দিয়েছিলেন যে, নিয়ামতে মগ্ন থাকার ব্যাপারে সাবধান হও। কেননা আল্লাহর বান্দাগণ কখনো নিয়ামতে মগ্ন থাকতে পারেনা।

-শাইখ সালেহ আল মুনাজ্জিদ



মন্তব্য