সিয়াম

রমযানের শিক্ষা কি ছিল।

Alorpath 2 months ago Views:237

নিশ্চয়ই আল্লাহ ঐ পর্যন্ত কোন জাতির পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদেরকে পরিবর্তন করে নেয়।


রমযানের রােযা সাধনার মাধ্যমে বান্দা রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তির সুসংবাদের আনন্দ লাভ করে। ঈদুল ফিতরের দিন তার আংশিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে । আল্লাহ এর মাধ্যমে বান্দার আনন্দের সামান্য নমুনা দেখান। মু'মিনের আসল আনন্দতে হবে বেহেশতে আল্লাহর সাথে। সত্যিকার আনন্দ বা খুশী আসে আল্লাহর আনুগত্য বা আদেশ-নিষেধ মানার মাধ্যমে। তাই রমযানের পরে আল্লাহর অন্যান্য আদেশ-নিষেধ মেনে চললে সেই আনন্দ পূর্ণতা লাভ করবে। ঈদে নতুন কাপড়-চোপড় ও সাজ-সজ্জার প্রচলন আছে। এ প্রসঙ্গে একজন আরবি কবি বলেছেন- “ঈদ সেই ব্যক্তির জন্য নয় যে নতুন পােশাক পরে, বরং ঈদ সে ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহর আযাবকে ভয় করে। ঈদ সে ব্যক্তির জন্য নয় যে সওয়ারীতে আরােহণ করে, বরং ঈদ সে ব্যক্তির জন্য যে গুনাহর কাজ ত্যাগ করে।”

এক নেক ও বুজুর্গ ব্যক্তি ঈদের দিন কিছু লােককে খেলাধুলায় মশগুল দেখে বললেন, 'তােমরা যদি নেক কাজ করে থাক তাহলে তা নেক কাজের শুকরিয়া নয়, আর যদি পাপ কাজ করে থাক তাহলে দয়াবান আল্লাহর সাথে এভাবে আর কত করবে?


হজ্জের দিন আরাফাতের ময়দানে সূর্যাস্তের সময় খলীফা ওমর বিন আবদুল আযীয কিছু লােককে উট ও ঘােড়র উপর দ্রুত দৌড়াতে দেখে মন্তব্য করেন, ‘আজ যার ঘােড়া বা উটে দ্রুতগামী সে বিজয়ী প্রতিযােগী নয়, বরং সেই বিজয়ী প্রতিযােগী যার গুনাহ মাফ হয়েছে। রমযানেও গুনাহ মাফের প্রতিযােগিতাই কাম্য অন্য কোন প্রতিযােগিতা নয়।

আলী (রা)-এর মতে, মুসলমানের ঈদ প্রতিদিন। প্রতিদিনই তারা গুনাহ থেকে দূরে থেকে সওয়াব ও মুক্তির খুশী লাভ করে।

রমযান পরবর্তী সময়ে আমাদের কি করণীয়? এ বিষয়ে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হলাে, যারা রমযান আসলে ইবাদত করে ও কষ্ট করে এবং রমযান চলে গেলে আবার গাফেল হয়ে যায় তাদের ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি? তিনি উত্তর দেন, তারা কতইনা বদ-নসীব যারা শুধু রমযানে আল্লাহর অনুগ্রহ বুঝতে পারে।' নেক আমল কবুলের লক্ষণ হলাে, পরবর্তীতে তা অব্যাহত রাখা। যেমন নামায কবুলের লক্ষণ হলাে, নফল নামায আদায় করার আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া।

মাহে রমযান একটি ঈমানী পাঠশালা, সারা বছরের পাথেয় উপার্জন, সারা জীবনের মাকসাদকে শানিত করার জন্যে এটি একটি রুহানি ময়দান। যে ব্যক্তি মাহে রমযানে নিজেকে সংশােধন করতে পারল না সে আর কখন নিজের জীবন গঠন করবে?

মাহে রমযানই এমন একটি প্রতিষ্ঠান যাতে আমরা নিজেদের আমল, শরিয়ত পরিপন্থী আচার ব্যবহার পরিত্যাগ ও চরিত্র সংশােধন করে নিতে পারি।

আল্লাহ তাআলা বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ ঐ পর্যন্ত কোন জাতির পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদেরকে পরিবর্তন করে নেয়।” (সূরা রা'দ : আয়াত-১১)

যদি তুমি সত্যিকার অর্থে রমযান পেয়ে লাভবান হয়ে থাক আর মুত্তাকিদের গুণাবলি অর্জন করে রােযা, তারাবির নামায সম্পাদন করে থাক, তাহলে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা কর। তার শোকর আদায় কর এবং তার কাছে মৃত্যু পর্যন্ত অটল থাকার তাওফীক কামনা কর।

তুমি ঐ নারীর মতাে হয়াে না, যে নাকি সুতা দিয়ে সুন্দর করে সুয়েটার বুনল, যখন তা তাকে আকৃষ্ট করল, তখন একটি একটি করে সুতা খুলে ফেলতে লাগল । মানুষ তার সম্পর্কে কী মন্তব্য করবে? রমযান শেষে যে পুনরায় গুনাহের দিকে ফিরে গিয়ে নেক আমল ছেড়ে দেয়, তার অবস্থাতাে ঐ নারীর মতােই। আনুগত্য ও মুনাজাতের স্বাদ পাওয়ার পরেও পুনরায় গুনাহ ও অপরাধের দিকে কীভাবে ফিরে যায়?

সুহৃদয় পাঠকবর্গ! আমরা রমযানে আল্লাহর সাথে যে ওয়াদা করেছি তা ভঙ্গ করার অনেক চিত্র সমাজে ফুটে উঠেছে। যেমন-

১. ঈদের দিনেই জামাতে নামায আদায় ছেড়ে দেয়া। তারাবির মতাে সুন্নাত নামাযে মসজিদ ভরা মুসল্লি থাকার পর এখন ফরজ নামাযের সময়ই মুসল্লির সংখ্যা খুব কমে যাওয়া।

২. গান-বাদ্য ও সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়া।

৩, বেহায়া ও বেলেল্লাপনার সাথে হাট-বাজারে ও পার্কে ছেলে-মেয়েদের সহাবস্থান ইত্যাদি। তাহলে কি এভাবেই আমরা মাহে রমযানকে বিদায় জানাব?

এত বড় নেয়ামতের এটাই কি শােকর আদায়, এটাই কি আমল কবুল হওয়ার নিদর্শন? নিশ্চয় নয়। বরং এটা আমল কবুল না হওয়ার আলামত। কেননা প্রকৃত রােযাদার ঈদের দিন রােযা ছেড়ে দিয়ে আনন্দিত হবে এবং রােযা পূর্ণ করার তাওফীক পাওয়ার দরুন তার প্রতিপালকের প্রশংসা করবে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। সাথে সাথে এ ভয়ে কাঁদবে যে, না জানি আমার রােযা কবুল হয়নি।

আমাদের পূর্বসূরীগণ মাহে রমযানের পর ছয় মাস পর্যন্ত আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে রােযা কবুল হওয়ার দোয়া করতেন। আমল কবুল হওয়ার আলামত হলাে, পূর্ববর্তী অবস্থার চেয়ে বর্তমান অবস্থা উন্নত হওয়া ।
আল্লাহ তাআলা বলেন: “মৃত্যু পর্যন্ত তােমার রবের ইবাদত কর।” (সূরা আল-হিজর : আয়াত-৯৯)


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “বল, বিশ্বাস স্থাপন করলাম আল্লাহর প্রতি, এবং অবিচল থাক।” (মুসলিম) সত্যিকার মু'মিন বান্দা সর্বদাই আল্লাহর ইবাদত করবে। কোন নির্দিষ্ট মাস, জায়গা অথবা জাতির সাথে মিলে আমল করবে না, বরং সর্বদা সে ইবাদত করবে। মুমিন বান্দা মনে করবে যিনি রমযানের প্রভু তিনি অন্যান্য সকল মাসেরও প্রভু। তিনি সকল কাল ও স্থানের প্রভু। রমজান শেষ হয়ে গেলেও শাওয়ালের ছয় রােযা, আশুরা, আরাফা, সােমবার, বৃহস্পতিবার ইত্যাদি নফল রােযা রয়েছে। তারাবীহের নামায শেষ হয়ে গেলেও তাহাজ্জুদ নামায বাকি আছে সারা বছর। অতএব, নেক আমল সব সময় সব জায়গাতেই করা যায় । হে ভাই! তুমি নেক আমলের চেষ্টা করতে থাক। অলসতা কর না। যদি তুমি নফল আদায় করতে না চাও, তাহলে কমপক্ষে ফরজ, ওয়াজিব ছেড়ে দিয় না। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীনের ওপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন।
আমিন!



মন্তব্য