বিষয়ভিত্তিক হাদিস

হাদিসের পরিভাষা

Alorpath 8 months ago Views:90

হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি। পর্ব :১


হাদীস (حَدِيْث) এর শাব্দিক অর্থ:

তুন, প্রাচীন পুরাতন এর বিপরীত বিষয়। অর্থে যে সব কথা, কাজ বস্ত্ত পূর্বে ছিল না, এখন অস্তিত্ব লাভ করেছে তাই হাদীস। এর আরেক অর্থ হলো: কথা। ফক্বীহগণের পরিভাষায় নাবী কারীম () আল্লাহ্ রাসূল হিসেবে যা কিছু বলেছেন, যা কিছু করেছেন এবং যা কিছু বলার বা করার অনুমতি দিয়েছেন অথবা সমর্থন জানিয়েছেন তাকে হাদীস বলা হয়। কিন্তু মুহাদ্দিসগণ এর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ () সম্পর্কিত বর্ণনা তার গুণাবলী সম্পর্কিত বিবরণকেও হাদীসের অন্তর্ভুক্ত করেন। হিসেবে হাদীসকে প্রাথমিক পর্যায়ে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়:

১। ক্বওলী হাদীস:

কোন বিষয়ে রাসুলুল্লাহ () যা বলেছেন, অর্থাৎ যে হাদীসে তাঁর কোন কথা বিবৃত হয়েছে তাকে ক্বওলী (বাণী সম্পর্কিত) হাদীস বলা হয়


২। ফেলী হাদীস:

মহানাবী ()-এর কাজকর্ম, চরিত্র আচার-আচরণের ভেতর দিয়েই ইসলামের যাবতীয় বিধি-বিধান রীতিনীতি প্রস্ফুটিত হয়েছে। অতএব যে হাদীসে তাঁর কোন কাজের বিবরণ উল্লেখিত হয়েছে তাকে ফেলী (কর্ম সম্পর্কিত) হাদীস বলা হয়

৩। তাকরীরী হাদীস:

সাহাবীগণের যে সব কথা বা কাজ নাবী কারীম ()-এর অনুমোদন সমর্থন প্রাপ্ত হয়েছে, সে ধরনের কোন কথা বা কাজের বিবরণ হতেও শরীয়াতের দৃষ্টিভঙ্গি জানা যায়। অতএব যে হাদীসে ধরনের কোন ঘটনার বা কাজের উল্লেখ পাওয়া যায় তাকে তাকরীরী (সমর্থন মূলক) হাদীস বলে

সুন্নাহ (السنة):

হাদীসের অপর নাম সুন্নাহ্ (السنة) সুন্নাত শব্দের অর্থ চলার পথ, কর্মের নীতি পদ্ধতি। যে পন্থা রীতি নাবী কারীম () অবলম্বন করতেন তাকে সুন্নাত বলা হয়। অন্য কথায় রাসুলুল্লাহ () প্রচারিত উচ্চতম আদর্শই সুন্নাত। কুরআন মাজিদে মহত্তম সুন্দরতম আদর্শ (أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ) বলতে এই সুন্নাতকেই বুঝানো হয়েছে

খবর (خبر):

হাদীসকে আরবী ভাষায় খবরও (خبر) বলা হয়। তবে খবর শব্দটি হাদীস ইতিহাস উভয়টিকেই বুঝায়

আসার (أثر ):

আসার শব্দটিও কখনও কখনও রাসুলুল্লাহ () এর হাদীসকে নির্দেশ করে। কিন্তু অনেকেই হাদীস আসার এর মধ্যে কিছু পার্থক্য করে থাকেন। তাঁদের মতে- সাহাবীগণ থেকে শরীয়াত সম্পর্কে যা কিছু উদ্ধৃত হয়েছে তাকে আসার বলে

ইলমে হাদীসের কতিপয় পরিভাষা

সাহাবী (صحابى):

যিনি ঈমানের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ () এর সাহচর্য লাভ করেছেন এবং ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁকে রাসুলুল্লাহ ()-এর সাহাবী বলা হয়

ঈমানের শাখা সমূহ

তাবেঈ (تابعى) :

যিনি রাসুলুল্লাহ ()-এর কোন সাহাবীর নিকট হাদীস শিক্ষা করেছেন অথবা অন্ততপক্ষ তাঁকে দেখেছেন এবং মুসলমান হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁকে তাবেঈ বলা হয়

তাবে-তাবেঈ (تابعى تابع) :

যিনি কোন তাবেঈ এর নিকট হাদীস শিক্ষা করেছেন অথবা অন্ততপক্ষ তাঁকে দেখেছেন এবং মুসলমান হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁকে তাবে-তাবেঈ বলা হয়

মুহাদ্দিস (محدث) :

যিনি হাদীস চর্চা করেন এবং বহু সংখ্যক হাদীসের সনদ মতন সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান রাখেন তাঁকে মুহাদ্দিস বলা হয়

শাইখ (شيخ) :

হাদীসের শিক্ষাদাতা রাবীকে শায়খ বলা হয়

শাইখান (شيخان) :

সাহাবীগনের মধ্যে আবূ বকর (রা.) উমর (রা.)- কে একত্রে শাইখান বলা হয়। কিন্তু হাদীস শাস্ত্রে ইমাম বুখারী (রাহি.) ইমাম মুসলিম (রাহি.)-কে এবং ফিক্বহ-এর পরিভাষায় ইমাম আবূ হানীফা (রাহি.) আবূ ইউসুফ (রাহি.)-কে একত্রে শাইখান বলা হয়

হাফিয (حافظ) :

যিনি সনদ মতনের বৃত্তান্ত সহ এক লাখ হাদীস আয়ত্ত করেছেন তাঁকে হাফিয বলা হয়

হুজ্জাত (حجة) :

অনুরূপভাবে যিনি তিন লক্ষ হাদীস আয়ত্ত করেছেন তাঁকে হুজ্জাত বলা হয়

হাকিম (حاكم) :

যিনি সব হাদীস আয়ত্ত করেছেন তাকে হাকিম বলা হয়

রিজাল (رجال) :

হাদীসের রাবী সমষ্টিকে রিজাল বলে। যে শাস্ত্রে রাবীগণের জীবনী বর্ণনা করা হয়েছে তাকে আসমাউর-রিজাল বলা হয়

রিওয়ায়াত (رواية):

হাদীস বর্ণনা করাকে রিওয়ায়াত বলে। কখনও কখনও মূল হাদীসকেও রিওয়ায়াত বলা হয়। যেমন- এই কথার সমর্থনে একটি রিওয়ায়াত (হাদীস) আছে

আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ সমূহ

সনদ (سند):

হাদীসের মূল কথাটুকু যে সূত্র পরম্পরায় গ্রন্থ সংকলনকারী পর্যন্ত পৌঁছেছে তাকে সনদ বলা হয়। এতে হাদীস বর্ণনাকারীদের নাম একের পর এক সজ্জিত থাকে

মতন (متن):

হাদীসে মূল কথা তার শব্দ সমষ্টিকে মতন বলে

মারফূ (مرفوع):

যে হাদীসের সনদ (বর্ণনা পরম্পরা) রাসুলুল্লাহ () পর্যন্ত পৌঁছেছে তাকে মারফূ হাদীস বলে

মাওকূফ (موقوف) :

যে হাদীসের বর্ণনা- সূত্র ঊর্ধ্ব দিকে সাহাবী পর্যন্ত পৌঁছেছে , অর্থাৎ যে সনদ -সূত্রে কোন সাহাবীর কথা বা কাজ বা অনুমোদন বর্ণিত হয়েছে তাকে মাওকূফ হাদীস বলে। এর অপর নাম আসার

মাকতূ (مقطوع):

যে হাদীসের সনদ কোন তাবেঈ পর্যন্ত পৌঁছেছে, তাকে মাকতূ হাদীস বলা হয়

তালীক (تعليق):

কোন কোন গ্রন্থকার হাদীসের পূর্ণ সনদ বাদ দিয়ে কেবল মূল হাদীস বর্ণনা করেছেন। এরূপ করাকে তালীক বলা হয়

মুদাল্লাস (مدلس):

যে হাদীসের রাবী নিজের প্রকৃত শাইখের (উস্তাদের) নাম উল্লেখ না করে তার উপরস্থ শাইখের নামে এভাবে হাদীস বর্ণনা করেছেন যাতে মনে হয় যে, তিনি নিজেই উপরস্থ শাইখের নিকট তা শুনেছেন অথচ তিনি তাঁর নিকট সেই হাদীস শুনেন নি- সে হাদীসকে মুদাল্লাস হাদীস এবং এইরূপ করাকেতাদ্লীসআর যিনি এইরূপ করেন তাকে মুদাল্লীস বলা হয়

মুযতারাব (مضطرب):

যে হাদীসের রাবী হাদীসের মতন সনদকে বিভিন্ন প্রকারে বর্ণনা করেছেন সে হাদীসকে হাদীসে মুযতারাব বলা হয়। যে পর্যন্ত না এর কোনরূপ সমন্বয় সাধন সম্ভবপর হয়, সে পর্যন্ত এই হাদীসের ব্যাপারে অপেক্ষা করতে হবে অর্থাৎ এই ধরনের রিওয়ায়াত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না

মুদ্রাজ (مدرج):

যে হাদীসের মধ্যে রাবী নিজের অথবা অপরের উক্তিকে অনুপ্রবেশ করিয়েছেন, সে হাদীসকে মুদ্রাজ এবং এইরূপ করাকেইদরাজবলা হয়

মুত্তাসিল (متصل):

যে হাদীসের সনদের ধারাবাহিকতা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পূর্ণরূপে রক্ষত আছে, কোন স্তরেই কোন রাবীর নাম বাদ পড়ে নি তাকে মুত্তাসিল হাদীস বলে

মুনকাতি (منقطع):

যে হাদীসের সনদে ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়নি, মাঝখানে কোন এক স্তরে কোন রাবীর নাম বাদ পড়েছে, তাকে মুনকাতি হাদীস, আর এই বাদ পড়াকে ইনকিতা বলা হয়

মুরসাল (مرسل):

যে হাদীসের সনদে ইনকিতা শেষের দিকে হয়েছে, অর্থাৎ সাহাবীর নাম বাদ পড়েছে এবং তাবেঈ সরাসরি রাসুলুল্লাহ () এর উল্লেখ করে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাকে মুরসাল হাদীস বলা হয়

মুআল্লাক ( معلق ) :

সনদের ইনকিতা প্রথম দিকে হলে, অর্থাৎ সাহাবীর পর এক বা একাধিক রাবীর নাম বাদ পড়লে তাকে মুআল্লাক হাদীস বলা হয়

মুদাল (معضل):

যে হাদীসে দুই বা ততোধিক রাবী ক্রমান্বয়ে সনদ থেকে বাদ পড়েছে তাকে মুদাল হাদীস বলে



মন্তব্য